টান

আঁধার পুরোপুরি কাটেনি। পূব দিকে আবছা আলোর আভাস ।পাখির কুজনে তন্দ্রা ছুটে যায় দুলালের মায়ের। নাহ!,দুলালের মার কোন নাম আজ পর্যন্ত আছে বলে মনে হয়নি। সবাই দুলালের মা দুলালের মা বলেই তো ডাকে।নিজেও বোধহয় নিজের নামটাও ভুলে গেছে। দুলালের বাপ কি কখন নাম ধরে ডেকেছিল! কে জানে অবশ্য দুলালের বাপের সে সময়ই বা কোথায়?

কি যেন একটা স্বপ্ন শেষরাতে দেখছিল দুলালের মা। আচমকা অবোধ কাঙালির ব্যা ব্যা ডাক মনে হল কানে এল। কাঙালি বড়ই আদরের। পাঁচ বাড়ীতে কাজ করে অল্প পয়সা জমিয়ে গত বৈশাখ মাসেই ঘোষ বাবুদের বাড়ি থেকে ছ’শ টাকা দিয়ে কিনে এনেছে দুলালের মা। কালো কুচকুচে গা,আলো যেন পিছলে পড়ে।সারাদিন খুঁটের সঙ্গে বাঁধা থাকলেও দুটো কাঁঠাল পাতা  পেলেই খুশি।সকালে আর সন্ধ্যায় একটু সোহাগ তাতেই দুলালের মা আর কাঙালির আনন্দ।

দুলালের মার মুখে খালি কাঙালির ই গল্প।পথে সেদিন দুলালের মার  সঙ্গে দেখা।বললাম, কি গো কি খবর?দুলালের কি খবর… কাঙালি কত বড় হল ? দুলালের কথা শুনে যত না  খুশি মনে হল কাঙালির হালহকিকত  জিগ্যেস করায় দ্বিগুন উৎসাহী হয়ে বলল  ” কাঙালির দুইডা ছানা হইসে”।বললাম ,বাঃ তোমার তো সুদিন এল মনে হচ্ছে! বলল “হ!”
“তো দুলালের কি খবর?”
“আর কইয়েন না, ইস্কুলে যাইবনা,নিত্যনতুন জামাপ্যান্ট লাগে,কয় বন্ধুরার লগে নাইলে মিশন যায় না! কয় দুকান দিমু পয়সা দাও। আমি গরীব মানু পয়সা কই পামু!”
“কেন দুলালের বাপ কি করে? কাজ করে না?”
“হ, আর করসে! সারাদিন ঘুমাইয়াই কুল পায়না। টাইমে টাইমে খাওন ডা  ঠিক চাই নাই লে রক্ষা নাই।”
“তা তুমি আর কত টানবে?”  আমি বললাম।
“দেহি! মাইয়া মানুশ যখন আর কি করুম! এই ছাগলের ব্যবসা কইর‍্যা দেহি কতদুর কি করতাম পারি”।বললাম  “দেখো”।

এর মধ্যে বছর দুই কেটে গেছে। দুলালের মা একটু একটু করে সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছে। দশ বারোটা ছাগল ছানা বেচে ঘরে টিন দিয়েছে। তবু  ও , কি যেন মনে হল  শান্তি নাই  দুলালের মার মনে।এক্টু যেন আনমনা ঠেকে। উদয়াস্ত পরিশ্রম করতেও পারে বটে! দেখে আশ্চর্য হই। বলি  কি গো দুলালের মা আর কতো করবে? দুলালের দোকান ও তো চলছে ভালই।বাসার কাজ একটু কম কর না ।

“না গো দিদিমনি সংসার আমারই টানন লাগে। দুলালের রোজগার দুলালের জামা কাপড়েই যায়। দুলালের বাপ মাঝে মইধ্যে যা কাম কইর‍্যা পায় সবই দুইদিনে ফুড়ুৎ। আমি কাম কমাইলে একবেলা খাওন লাগব ।”

অগত্যা দুলালের মার জীবন চলল এক ই গতিতে।

সেদিন সন্ধ্যে হয় হয়,সবে কাজ কর্ম সেরে চায়ের কাপ টা নিয়ে বসেছি। হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক শব্দ।বিরক্তই হলাম।দেখি ধীরে ধীরে আনমনা হয়ে দুলালের মা ঢুকল ।
“কি ব্যাপার এই ভর সন্ধ্যেবেলা এমন গোমড়া মুখে?”
“দিদিমণি কাউরে কইতাম পারিনা, বুকডা ফাইট্যা যাইতাসে”।
“বলনা কি হয়েছে” আমি বলি।
“কাঙালি আছেনা?”
বলি – হ্যাঁ, তো কি হয়েছে বলবে তো!!
“কাঙালির চাইরটা ছানা আছেনা, ”
“হ্যাঁ তো হয়েছে টা কি বলবে তো!”
“কেউ নাই সব বেইচ্যা দিসে”
“কে বেচলো  গো?” আমি শুধাই।
“কেডা আবার!  দুলাল আর দুলালের বাপে। আমি ঘরে আসলাম না,বাপে পুতে সব কডারে নিয়া গিয়া বেইচ্যা দিসে । দিয়া  টিভি কিনছে ।”
আমি হতবাক, বলি টিভি?”
“হ তারা টিভি দেখব”।

টসটস করে দুলালের মার চোখ দিয়ে জল পড়ে।” দিদিমনি গো কেউ আমার কষ্ট ডা  বুঝল না। কাঙালির লেইগ্যা প্রাণডা খালি কান্দে। পারিনাগো দিদিমনি পারিনা। ঘরে যাইলে খুটের দিকে তাকাই আর বুকডা  হা হা কইর‍্যা উঢে।আমার সব স্বপ্ন শ্যাষ হইয়া গেল গো দিদিমনি। কত্ত আশা করসিলাম। কাঙালিটা আমারে ছাইর‍্যা থাকতেই পারতনা।”

আনমনা দুলালের মা কে বললাম, বসো চা খেয়ে যাও। এক আকাশ  শুন্যতা ভরা চোখ নিয়ে থরথর ঠোঁটে অস্ফুটও  দুটো    শব্দ ভেসে আসে “না থাক, আজ যাই।” আধো অন্ধকারে  ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় একটা শরীর।

Advertisements

One Comment Add yours

  1. Anonymous says:

    Touching story

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s